চরমপত্র ২০১৫

তারা বলতেন বঙ্গভূমির বাতাসেই কিছু একটা আছে। শুধু এখানকার ছোট ছোট রাজারাই নয়; এদেশের চাষি তাঁতি জেলেরা পর্যন্ত স্বাধীনচেতা। প্রাচীন যুগের বহু দিগ্বিজয়ীর জয়যাত্রা এই অবধি এসে থেমে গেছে। এমনকি যতবার কোনো বহিরাগত শাসক বা তার প্রতিনিধি এই জলাভূমি অধিকার করতে সক্ষম হয়েছে, বাংলার মাটিই তাকে অবাধ্য করে তুলেছে। এই জলবায়ু যেমন দু’হাত ভরে দেয় তেমনি একসময় সবকিছু উজাড় করে নিয়েও যায়। সত্য যে, প্রাকৃতিক প্রাচুর্যের কারণে আমাদের ললাট প্রশস্ত হয়নি, আমাদের মুষ্টি দৃঢ় হয়নি। আবার এও সত্য যে, প্রতিটা মন্বন্তর আমাদের আরো সহনশীল করেছে। জ্বলোচ্ছাসের প্রতিটা ঢেউ আমাদের আরো সুদৃঢ় করেছে। বিদেশি আগ্রাসন আমাদের আরো দুর্দম্য করেছে। অযোদ্ধা বাঙালি জন্মান্তর থেকে শোষণ আর যুদ্ধ দেখতে দেখতে এসেছে। বারবার পড়েছি আমরা। বারবার উঠে দাঁড়িয়েছি ধ্বংসস্তূপ থেকে। 

এই বাঙালির রক্তে এসে মিশেছে পৃথিবীর নানা প্রান্তের নির্যাস। এই জলার স্থৈর্য তো ছিলই। সাথে যোগ হয়েছে মরুভূমির তেজ। এসেছে হিমালয়ের অটলতা। পাষাণ প্রান্তরের কাঠিন্য এসেছে। সমুদ্রের উচ্ছ্বাস এসে মিশেছে আমাদের কোষে। বাঙালি সবার মতো। বাঙালির মতো আর কেউ নয়। তাই আজকে যারা ভাবছে আমাদের বিকলাঙ্গ করে, আমাদের বন্দী করে, আমাদের রক্ত মজ্জা শুষে নিবে – এ তাদের ভ্রম মাত্র। 

যে দেশের স্বপ্ন আমাদের দেখান হয়েছিল স্পষ্টতই এই বাংলাদেশ সে দেশ নয়। আমাদের সব হওয়ার কথা ছিল। সবকিছু পাওয়ার কথা ছিল। আমরা বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারতাম। এমনকি আজও এই বাংলাদেশ লক্ষ সম্ভাবনার দেশ। এদেশের দুই অনন্য সম্পদ আছে। এক হলো এর মাটি। আর এক হলো এর মানুষ। তা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃত অবহেলায় আমরা আমাদের সোনালি দিন দেখতে পাচ্ছি না। লোভ আর স্বার্থপরতা আমাদেরকে টেনে ধরেছে। আমাদের সামর্থ্য ছিল বিশ্ব মোড়লদের কাঁচকলা দেখানর। অথচ আজ তাদের উদ্ধত চোখ রাঙানি দেখতে হচ্ছে। কিন্তু কেন? কেন আমরা আমাদের বিশাল জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হলাম? নিজেদের মতো একটা রাষ্ট্র পাওয়ার চুয়াল্লিশ বছরেও কেন আমরা সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে পারলাম না? 

এসব প্রশ্নের নানারকম উত্তর দেয়া হয়েছে। কিন্তু সত্য এত রঙিন নয়। সত্য একটাই আর তা খুব সোজাসাপ্টা। সত্য হচ্ছে, এই সমাজ ও রাষ্ট্রের সবগুলো স্তর দুর্নীতিগ্রস্ত। বাংলাদেশ জুড়ে এই দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে কর্কট রোগের মতো। আর সেই রোগের উৎস কতিপয় মানুষ বা গোষ্ঠী। যারা যুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে দেশটাকে নিজেদের মুঠোয় রেখেছে, ইচ্ছামত ব্যবহার করেছে, বিক্রি করেছে সুবিধামত। মসনদে আসীনদের সাথে এদের একটা বনিবনা থাকে বরাবর। এরা গণমাধ্যমকে পরিচালিত করে। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এদেরই মালিকানাধীন। এরা চিরকাল ধরা ছোঁয়ার বাইরে, সব আইনের ঊর্ধ্বে। প্রশ্ন হলো – যে অশুচি রাষ্ট্রব্যবস্থা পূর্বজেরা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে সেই একই ঘুণে ধরা কাঠামো আমরা অনাগতদের ওপর চাপিয়ে দিব কিনা। আমরা কি নীরবে অপেক্ষা করব প্রিয় মাতৃভূমির শেষকৃত্য দেখার, নাকি এর পুনর্জাগরণের শিঙা ফুঁকব। 

আমাদের যাবতীয় বঞ্চনার কারণ যেমন সরল, নির্বাণ লাভের পথটাও একইরকম ঋজু। এক, অপক্ষমতার কেন্দ্রের মানুষগুলোকে শনাক্ত করতে হবে। দুই, এদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করতে হবে। অন্যায় প্রতিহত করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা এতকাল নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে এসেছে তারাও সমান অপরাধী। তিন, অতিদ্রুত তাদেরকে ন্যায়বিচারের সম্মুখীন করতে হবে এবং প্রাপ্য দণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। ক্যান্সারের আরোগ্য একটাই আর তা হলো রোগগ্রস্ত কোষকে নিশ্চিহ্ন করা। প্রথম দুইটা পদক্ষেপ খুব সহজ। এই দুইটা কাজ আমরা ইতোমধ্যে সম্পন্ন করে ফেলেছি। এখন পৌঁছে গেছি আমাদের সর্বশেষ লক্ষ্যের সামনে। 

হ্যা আমরা জানি, এই লক্ষ্য অর্জন করা সহজসাধ্য নয়। যেখানে প্রতিপক্ষ অসম শক্তিশালী। এই পথ চলায় প্রতিকূলতা অজস্র। এমনকি মৃত্যুও আসতে পারে। বিপ্লবী কি মরণের হাতছানি দেখে কখনো পিছপা হয়েছে? এও জানি যে, আমাদের উদ্দেশ্য সাধিত হলে সমাজে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হবে। সমাজ কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার আগে মিথ্যার ভিত পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেয়া জরুরি। আমরা বাংলাদেশের চূড়ান্ত মুক্তি চাই। ত্যাগের মধ্য দিয়ে, কষ্টের মধ্য দিয়ে না গেলে সেই মুক্তি সম্ভব না। দেশের জনসাধারণ আদিম গুহাবাসীর মতো অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সত্যের আলোয় তাদের চোখ ধাঁধিয়ে যেতে চাইবে। তারা মানতে চাইবে না। তাদের থেকে বাধা আসবে জানি। সামাজিক রাজনৈতিক প্রাসাশনিক সামরিক সব ধরনের বাধা আসবে আমাদের সামনে। কিন্তু প্রত্যয়ীর সামনে এসব বিঘ্ন কিছুই নয়। মনে নাই কাস্ত্রোর কৌশলগত বিজয়ের কথা? 

এই দেশে বহু ব্যর্থ অভ্যুত্থানের ইতিহাস আছে। দেশের শাসনব্যবস্থা আমূল বদলে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য ওই একটাই – আমাদের স্বচ্ছতা। আমাদের উদ্দেশ্যে কোনো ফাঁকি নাই। আমাদের কোনো গোপন লিপ্সা নাই। আমরা কারো অনুগত নই। আমাদের শুধু একটাই পরিচয়, আমরা বাঙালি। আমরা চাই প্রকৃত অর্থে স্বাধীন স্বনির্ভর এক বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশ কারো কাছে হাত পাতবে না। কারো কাছে মাথা নত করবে না। যেই অক্ষম প্রজন্ম এতকাল দেশটাকে হেরোইনখোরের মতো চালিয়ে নিয়ে এসেছে আমরা চাই তাদের চিরতরে উৎখাত করতে। হ্যা, আমাদের মধ্য থেকে যে আদর্শ শাসক পাওয়া যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নাই ঠিকই। আমরা তেমন কোনো দাবি তুলছিও না। কিন্তু জমিকে আগাছামুক্ত না করা পর্যন্ত সেখানে নতুন বীজ বপন বৃথা। এই অচলায়তন ভেঙে পরিবর্তনের সূচনা আমাদেরই করতে হবে। আর তারপর? তারপর আমাদের পরিকল্পনা কী সে নিয়ে আরেকদিন কথা বলব। আমরা কারা সেই জবাবটাও মুলতবি থাকল। আপাতত এটুকুই জেনে রাখুন যে, একটা ঝড় আসছে। দৌড়ে-লুকিয়ে-পালিয়ে ঝড়ের কবল থেকে রেহাই পাবে না কেউ। সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। সকলের বিচার হবে।  আপনি আমাদের সহায়তা করেন বা না-করেন, যুদ্ধ এরমধ্যে আরম্ভ হয়ে গেছে। আমাদের স্বপ্ন: এক প্রবল দুর্যোগের মধ্য দিয়ে অবসান হবে একটা দীর্ঘমেয়াদি অরাজকতার। সেই চরমাবস্থার মধ্য থেকে জন্ম নিবে আরো শক্তিশালী আরো মেধাবী এক বাংলাদেশ। সেদিন তাকে একটা লম্বা সালাম দিয়ে আমরা সরে দাঁড়াব।   

~ বাংলার বার ভূঁইয়া

 


মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ