পাঠ-প্রতিক্রিয়া দুই

শামীমা ইসলাম

"মুক্তির মন্দির সোপান তলে
কত প্রাণ হলো বলিদান
লেখা আছে অশ্রুজলে..."

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেকগুলো রূপ। সেই রূপের এক রূপকার মেজর রাশেদুল ইসলাম। তার জমজ পৌত্রী প্রজ্ঞা, প্রমীলা। ছোট থেকেই প্রজ্ঞা মানসিকভাবে একটু ভিন্নরকম। তীব্র মেধাবী কিন্তু কিছু ডিজঅর্ডার সম্পন্ন। আর প্রমি সাহসী, বুদ্ধিমতী, মেধাবী আর দেশপ্রেমিক। দাদু, নানুর যুদ্ধের গল্প দেশপ্রেমে ঢাল হিসেবে যুক্ত হয়েছে।

বংশানুক্রমে পাওয়া দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ হয়ে তারা একটি সংগঠন গড়ে তুলেছে। ভিন্ন ধারার এই সংগঠনের নাম "অধিনায়ক", যারা সক্রিয় রাজনীতির বলয় থেকে বেরিয়ে সুশৃঙ্খল একটি দেশকে গড়ার ব্রত বুকে নিয়ে সুগঠিতভাবে কাজ করছে। এদের নেটওয়ার্ক, এদের অর্থনৈতিক ভিত, এদের দলীয় বন্ধন এত শক্ত যে চাইলে এরা মন্ত্রীসভার মত দেশকে পরিচালিত করতে পারে।

স্কুল পড়ুয়া প্রমি সংগঠনের সর্বাধিনায়ক, যে কিনা এক আল বদর সদস্য ফাওয়াদের প্রেমে জড়িয়ে পড়েছে। ফাওয়াদের জঙ্গি সংগঠনে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি আরো বড় একটা ধাক্কা পায় প্রমি। তাদের সংগঠনের ওয়েবসাইট, বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের মধ্যে তীব্র বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আস্তে আস্তে পায়ের মাটি সরে যাবার মত আরো বড় একটা সত্যের মুখোমুখি হয় প্রমি। সে জানতে পারে তার এতদিনের আদর্শ মিথ্যা, তার দাদুর যোদ্ধা হবার জোরালো কোন প্রমাণ নেই নথীতে। বিপাকে জড়ায় প্রজ্ঞা, সরকারের রোষানলে অধিনায়ক আর আদর্শের টালমাটাল নৌকায় প্রমি।


লেখার শুরুতেই বলেছিলাম, কত প্রাণ হলো বলিদান লেখা আছে অশ্রুজলে। মেজর রাশেদ সাহেবের নামে কোন নথী নেই, প্রত্যক্ষ কোন প্রমাণ নেই কিন্তু তিনি যোদ্ধা। পাকিস্তানপন্থী এই যোদ্ধাও মুক্তিযোদ্ধা, গুরুত্বপূর্ণ এক যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিবাহিনীর ওপর তাক করা বন্দুকের নল চূড়ান্ত সময়ে তিনি পাকবাহিনীর মাথার দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন। ফলাফল পাকিস্তানের দোসর সেজে যে জাহাজে চেপে মুক্তি নিধনে বেরিয়েছিলেন সেই জাহাজেই পাক বাহিনীর অজস্র গুলি বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন।


এই বইটা ছোট ছোট গল্পের সম্মিলনে একটা বড় গল্প, বইটা ছোট ছোট ইতিহাসের সম্মিলনে একটা মহা ইতিহাসের স্মারক। আমাদের যুদ্ধ, যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ, আমাদের দেশে আটকে পড়া বিহারী, আমাদের দেশের ক্ষমতার চেয়ার আঁকড়ে থাকা সভাসদ, আমাদের তরুণ প্রজন্ম এবং আমাদের স্বপ্নের এক মহা আখ্যান অধিনায়ক

কোন মূল চরিত্রকে গড়ে ওঠা আখ্যান নয় বরং বহুমাত্রিক চরিত্রের মেলবন্ধন। গোয়েন্দা গল্পের মত সত্য উদঘাটনের আনন্দ, ইতিহাস উপলদ্ধি করার মত মানসিকতা কিংবা তরুণ প্রজন্মের চোখে বাংলাদেশ, আপনি যেভাবে নেবেন বইটিকে বইটি সেভাবেই ধরা দেবে।


লাল সবুজ প্রচ্ছদের বইটি এক টুকরো বাংলাদেশ। প্রচ্ছদের অন্ধকার অবয়ব যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। যার ছোট ছোট অধ্যায়গুলোর প্রতিটির শুরুতে রয়েছে বিখ্যাত সব বই থেকে পাওয়া কাহিনী সম্পৃক্ত সব উক্তি।


বয়সে তরুণ একজন লেখকের কলম থেকে উঠে আসা অধিনায়ক অনেকবেশী পরিণত। এই বই এতই বৈচিত্র্যময় যে পাঠক তালগোল পাকাতে বাধ্য হবেই। আমি নিজেও, ৫০ পৃষ্ঠা পড়ার পর ব্লকে চলে গিয়েছিলাম। মাসখানেক পর আবার ১০০ পৃষ্ঠার মত পড়েছি। তারপর আজ সকালে ২৪০ পৃষ্ঠার বইয়ের বাকি অংশ। বিরতি দিয়ে পড়ায় মনোযোগ ছুটে যাচ্ছিলো বারবার। তবে এটাও সত্য এই বই বারবার পড়তে হবে। একবার পড়েই এর গুণগত মান যাচাই করাটা বোকামি। এবং আনন্দের বিষয় এই পুরো বইয়ে কোন অসংলগ্ন বাক্য নেই, ঘটনা পরম্পরার অসামঞ্জস্যতা নেই, নেই কোন বানান ভুল। অন্তত আমার চোখে পড়ে নি। বরং মুক্তিযুদ্ধ ও বর্তমান সমান্তরালে এগিয়ে চলেছে।


কিছুটা দুর্বোধ্য ঠেকেছে, ঘটনা কিছুটা বিস্তৃত মনে হয়েছে। সেই প্রতিক্রিয়া থেকে মনে হয়েছে আর একটু কম ছড়িয়ে ছিটিয়ে আর একটু গুছিয়ে, বর্ণনাকে আর একটু খাপে এনে প্রকাশ করলেও করা যেতো। হয়তো সেক্ষেত্রে পাঠকমহলে তালগোল পাকানোর সম্ভাবনা কম। এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত।


বিতর্কিত বই নয় বরং মানসম্পন্ন বই নিয়ে বিতর্ক হোক।




আলোকচিত্র: রাম কৃষ্ণ সাহা



মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ